পিট সীগার

খুব ছোটবেলার কথা, তখনও ক্লাস ওয়ানে উঠিনি। একদিন দুপুরবেলায় নার্সারি স্কুল থেকে ফিরছি, হঠাৎ বাড়ির কাছে দাদা-দিদিদের স্কুলের মাঠে দেখি সবাই মিলে একসঙ্গে গান গাইছে:

একদিন সূর্যের ভোর
একদিন স্বপ্নের ভোর
একদিন সত্যের ভোর
আসবেই
এই মনে আছে বিশ্বাস
আমরা করি বিশ্বাস
সত্যের ভোর আসবে
একদিন।।
We shall overcome
We shall overcome someday
Oh deep in my heart
I do believe that
We shall overcome someday

শব্দগুলির মর্ম তখন খুব একটা বুঝিনি, কিন্তু গানটা কিরকম মাথায় বিঁধে গিয়েছিল - আগে কখনো বাংলা-ইংরেজী মেশানো গান শুনিনি, হয়তো সেই জন্যই।

এরপরে বেশ কিছু বছর কেটে গেছে - পাড়ার স্কুল ছেড়ে সাউথ পয়েন্টে পড়া শুরু করেছি, হয়তো ক্লাস ফাইভ কি সিক্স-এ পড়ি। একদিন শুনি মা খুব উত্তেজিত হয়ে কাউকে একটা বলছে, “জানো, নজরুল মঞ্চে পিট সীগার গান গাইবেন”। নজরুল মঞ্চের অনুষ্ঠানে যাওয়া শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি, কিন্তু সেই সুবাদে পিট সীগারের একটা ক্যাসেট বাড়িতে হাজির হল। বইয়ের আলমারির উপর ক্যাসেট প্লেয়ার থাকত - তখনও বেশ ছোটখাটো ছিলাম, তাই চেয়ার টেনে, তার উপর চড়ে, ক্যাসেট প্লেয়ারে ক্যাসেট চালিয়ে দেখি, ওমা, এতো সেই পুরোনো চেনা গান - We shall overcome। বার বার শুনলাম - আরো শুনলাম, গুয়ান্তানামেরা, Where have all the flowers gone, If I had a hammer, ইত্যাদি।

অনেক বছর পরে আবার - তখন আমি আমেরিকায়, MIT-তে পড়াশুনো শুরু করেছি। সারা দেশে Occupy আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে - বস্টনের ক্যাম্পে দুই একবার আমিও গিয়েছি, কথাবার্তা হচ্ছে কিভাবে ক্যাম্পে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একদিন সন্ধ্যেবেলায় দেখি, টিভিতে দেখাচ্ছে নিউ ইয়রর্য়কের রাস্তায় হাজার হাজার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৃদ্ধ পিট সীগার হাঁটছেন, সেই একই গান মুখে, We shall overcome।

গত মঙ্গলবার সকালবেলায় নিউ ইয়রর্য়ক টাইম্স খুলে জানতে পারলাম, পিট সীগার মারা গেছেন। মাথায় অনেক কিছু ভাবনা ঘুরছিল। সরাসরি কখনো দেখার সুযোগ হলো না, পিট-এর মাধ্যমেই আমার মার্কিন গানের সঙ্গে প্রথম আলাপ, ইত্যাদি। কিন্তু সবকিছুর মধ্যে যেটা বারবার ফিরে আসছিল, সেটা এই যে, পিট-এর মধে্য দিয়ে আমি এক অন্য আমেরিকাকে দেখেছি। যে আমেরিকাকে আমরা বাইরে থেকে রোজ টিভিতে, খবরের কাগজে দেখি, যে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ধর্মতলায় মিছিল হয়, সেই আমেরিকার থেকে আলাদা এক আমেরিকাকে পিট তুলে ধরতে পেরেছিলেন। পিট বলতেন, “The key to the future of the world, is finding the optimistic stories and letting them be known”। এই চিন্তাটাকে সবসময় মাথায় রাখাটা বোধহয় খুব জরুরী।

February 02, 2014